
ঝুঁকিপূর্ণ ৮ এলাকায় বিশেষ নজরদারি, নির্মাণসামগ্রী ও ময়লা-আবর্জনার বিরুদ্ধেও অভিযান
পারভেজ বাঙালী, চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম নগরীতে মাসব্যাপী বিশেষ মশক নিধন ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের সামনে থেকে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
চসিক সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিহ্নিত নগরীর আটটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব এলাকায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, লার্ভা নিধন এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থান, নালা-নর্দমা ও বিভিন্ন স্থাপনায় জমে থাকা পানির ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হবে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে নগরীতে বিটিআই (Bti) প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছর এ সময়ে সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৮০০-এর বেশি থাকলেও চলতি বছরে তা অনেক কমে এসেছে। একই সময়ে গত বছর ডেঙ্গুতে আটজনের মৃত্যু হলেও চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে শতাধিক কর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
চসিকের ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে নগরীর বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাস তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবেন। কোথাও ডেঙ্গুর লার্ভা বা মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জরিমানা ও কারাদণ্ডও দেওয়া হবে।
এদিকে একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে নগরীর কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা এলাকার ব্রিকফিল্ড রোড ও আশরাফ আলী রোডে পৃথক অভিযান চালানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার পরিচালিত এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন চসিকের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা এবং আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মৌমিতা দাশ।
অভিযানে বিভিন্ন বাসাবাড়ির ছাদবাগান ও নির্মাণাধীন ভবন সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। একই সঙ্গে রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী রেখে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার বিষয়েও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এ সময় রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী রাখা, বাসার নিচের নালায় জমাটবদ্ধ পানি থাকা এবং যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার অপরাধে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তাদের কাছ থেকে মোট ১১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
অভিযানকালে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মশক নিধনে জনসচেতনতা বাড়াতে এলাকাবাসীর মধ্যে চসিকের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ করা হয়।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধনের পাশাপাশি নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নালা-নর্দমা, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
তিনি বলেন, নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সফলতা সম্ভব নয়। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের এলাকায় পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা নির্মাণসামগ্রীতে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।
চসিক সূত্র আরও জানায়, আগামী এক মাস ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি নিয়মিত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলবে। পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন বিভাগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগও সমন্বিতভাবে এ কর্মসূচিতে অংশ নেবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে লিফলেট ও প্রচারণামূলক বিভিন্ন কনটেন্ট বিতরণ করা হবে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও এটি কোনো দিবসকেন্দ্রিক কার্যক্রম নয়। গত দুই-তিন মাস ধরেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে চসিক। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পুরো কার্যক্রম ব্যক্তিগতভাবে মনিটর করছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।